আজ

  • রবিবার
  • ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ফেনী-২ নির্বাচনী হালচাল> আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাঠে সক্রিয়

আপডেট : আগস্ট, ২৮, ২০১৮, ৬:৫০ অপরাহ্ণ

ফেনী 2,একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ফেনী-২ নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের অন্যতম শরীক জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে কেন্দ্র ভিত্তিক কমিটি গঠন এবং বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডের বিবরণ তুলে ধরে বিভিন্ন স্থানে মহিলাদের নিয়ে উঠান বৈঠক করার পাশাপাশি দলীয় কর্মীদের সক্রিয় রাখতে জাতীয় শোক দিবসসহ বিভিন্ন দিবসের কর্মসূচিসমূহ পালন করছে এবং সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগদান করে আগামীতে নির্বাচিত হলে আরো উন্নয়নের আশ্বাস দিচ্ছেন। অপরদিকে মামলা-হামলায় কাবু বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা সক্রিয় না থাকলে কৌশলে মাঠ দখলের চেষ্টায় কাজ করছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ-বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে তাদের ছবি সংবলিত পোষ্টার, ফেস্টুন শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও নির্বাচনী এলাকায় সাটিয়েছেন।
ফেনী পৌরসভা ও সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ফেনী জেলার গুরুত্বপূর্ণ আসন হচ্ছে ফেনী-২। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৩৩ হাজার ২৯১ জন। বরাবরই এ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা জেলার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। ফেনী সদর উপজেলা নিয়ে ফেনী-২ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে জয়নাল হাজারী জয়লাভ করেন ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে ও আর ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নিজাম উদ্দিন হাজারী সংসদ সদস্য হন। এর আগে বিএনপি থেকে অধ্যাপক জয়নাল আবদীন ভিপি জয়লাভ করেন ২০০১ ও ২০০৮ সালে। অতীতে দেখা গেছে, ফেনী-২ আসনে যিনি বিজয়ী হন, গোটা জেলার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তাঁর কাছে। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলা সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করার পাশাপাশি উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে সবকটি পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই জয়ী হন। ফলে অতীতের তুলনায় বর্তমানে ফেনীতে আওয়ামী লীগের অবস্থান অত্যান্ত শক্তিশালী। বর্তমান সরকার আমলে ফেনীতে দেশের প্রথম সিক্সলেন ফাইওভার, ফতেহপুরে চারলেনের উড়াল সেতু নির্মাণসহ অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা জানান, নিজাম উদ্দিন হাজারী ক্ষমতাকালে ফেনীতে রেকর্ডসংখ্যক উন্নয়ন হয়েছে এবং শান্তির সু-বাতাস বইছে। ফলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলে বিজয় সুনিশ্চিত ও অপ্রতিরোধ্য বলে মনে করছেন তারা।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নিজ জেলা হিসেবে ফেনীতে ভোট যুদ্ধে এগিয়ে আছেন বলে মনে করছেন বিএনপির নেতারা। বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান- সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জামানত হারাবে। মামলা-হামলায় জর্জরিত বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম অগোছালো হলেও কৌশলে নির্বাচনী মাঠে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।
২০১৪ সালের ভোটে ফেনীর ৩টি আসনেই মনোনয়নপত্র দাখিল করেন জয়নাল হাজারী। নানা ত্রæটি দেখিয়ে তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়। আসনটি বিএনপির দুর্গ ছিল। তবে বিএনপির ভিপি জয়নাল আর আওয়ামী লীগের জয়নাল হাজারীর লড়াই চলত বছরজুড়ে। তারা ছিলেন দুই দলের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৯৬ সালে জাসদ থেকে বিএনপিতে যোগ দেন ফেনী সরকারি কলেজের ভিপি অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন। বিএনপিতে দ্বিধা-বিভক্তি শুরু হয় ২০০৫ সাল। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ভাই প্রয়াত মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দারকে ফেনী জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব দেয়ার পর বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর জেলা বিএনপির কাউন্সিলে ভিপি জয়নালকে বাদ দেয়ায় তিনি রাজনীতির মূল ¯্রােত থেকে হারিয়ে যান। সেই থেকে বিএনপিতে দীনতা নেমে আসে। শুরু হয় বিভক্তি-কোন্দল।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এই আসনটি বিএনপি অধ্যুষিত বলে পরিচিত ছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় আসনটি চলে যায় আওয়ামী লীগের দখলে। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় এমপি নির্বাচিত হন নিজাম হাজারী। এবার সে রকম হওয়ার সম্ভাবনা কম। দুই দলেই রয়েছেন একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী।
আওয়ামী লীগ থেকে বর্তমান সাংসদ নিজাম হাজারীর পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা ও সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, একসময়ের আলোচিত সাবেক এমপি জয়নাল হাজারী, সাবেক ছাত্র-যুবনেতা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কৃষি বিষয়ক উপ-কমিটির নেতা কাজী ওয়ালী উদ্দিন ফয়সাল, বিশিষ্ট শিল্পপতি শাহেদ রেজা শিমুলসহ আরো দু-একজনের নাম দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে আলোচনা হলেও তাদের কেউ প্রকাশ্যে কোনো ঘোষণা দেননি। ইকবাল সোবহান চৌধুরী ২০০৯ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে হেরে যান বিএনপির দলীয় প্রার্থী অধ্যাপক জয়নাল আবদীন ভিপির কাছে।
নিজাম উদ্দিন হাজারীর রাজনৈতিক উত্থান খুব বেশি দিনের নয়। ২০১২ সালের ২৬ ডিসেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। এর আগে তিনি ২০১০ সালে ফেনী পৌরসভা নির্বাচনে তৎকালীন মেয়র বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুল আবছারকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়ে জেলার রাজনীতিতে নিজের ভিত গড়েন।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এ আসনে নিজাম উদ্দিন হাজারীকে চুড়ান্ত একক দলীয় প্রার্থী বলে মনে করেন। নেতাকর্মীরা মনে করেন- ফেনীর সব ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা নেতারা নিজাম হাজারীর অনুসারী। তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অন্য প্রার্থীর টিকে থাকাই দুরূহ হয়ে পড়বে।
দলীয় প্রার্থীতা প্রসঙ্গে নিজাম হাজারী বলেন, জেলা আওয়ামী লীগ এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। এ আসনে দলীয় প্রার্থীর বিজয় শতভাগ নিশ্চিত। আমার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। অনেক পেয়েছি, এখন দেয়ার পালা। বঙ্গবন্ধুর তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাকে যোগ্য মনে করবেন, তাকে দলীয় মনোনয়ন দেবেন। দলের প্রার্থীর পে কাজ করে যাব।
জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্র শীল বলেন, অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে নিজাম উদ্দিন হাজারী এমপির নেতৃত্বে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সুসংগঠিত। আগামী নির্বাচনেও নিজাম হাজারী দলীয় মনোনয়ন পেলে ‘নৌকা’ প্রতীক বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে বলে তিনি আশাবাদী।
ফেনী এক সময়ের বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও সা¤প্রতিক বছরগুলোতে মামলা-হামলায় কোণঠাসা রয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীরা। এছাড়াও জেলা বিএনপির বর্তমান দুর্বল নেতৃত্বের ফলে বিগত উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন নির্বাচনে অনেক জায়গায় প্রার্থী দিতে পারেনি স্থানীয় বিএনপি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দলীয়ভাবে অংশ নেবে নাকি বর্জন করবে এই নিয়ে রয়েছে দ্বিধা-দ্বন্ধ। তবে বিএনপি থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে বেশ কয়েকজনের নাম। তারা হলেন চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি অধ্যাপক জয়নাল আবদীন ভিপি, কেন্দ্রীয় সহ-প্রশিণ সম্পাদক রেহানা আক্তার রানু, ঢাকা মহানগর উত্তরের যুবদল নেতা রফিকুল আলম মজনু ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ফেনী জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক গাজী হাবিবুল্লাহ মানিকসহ আরো বেশ কয়েকজনের নাম।
বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় জেলার তিনটি আসনই চলে যায় আওয়ামী লীগের দখলে। আগামী নির্বাচনে অংশ নিয়ে সব কটি আসন পুনরদ্ধারের সময় এসেছে। দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া যাকে মনোনয়ন দেবেন তাকেই দলমত-নির্বিশেষে বিজয়ী করা হবে বলে নিজেদের আস্থার কথা জানান তারা।
মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি অধ্যাপক জয়নাল আবদীন ভিপি বলেন, আমি এ আসনে বিগত সময়ে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলাম। আশা করি আগামী নির্বাচনেও দল থেকে মনোনয়ন পাব। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মাঠে কাজ করার জন্য বলেছেন। আমি মাঠে সক্রিয় আছি।
জাতীয় পার্টির প থেকে জেলা জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার খোন্দকার নজরুল ইসলামকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে নেতাকর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করেছেন। নির্বাচন প্রসঙ্গে জেলা জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার খোন্দকার নজরুল ইসলাম বলেন- জাতীয় পার্টি মহাজোটে থেকে নির্বাচনে অংশ নিলে কেন্দ্রীয়ভাবে যে সিদ্ধান্ত নিবে সেটিই হবে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তবে আমরা নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছি এবং পার্টিকে সুসংগঠিত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছি। এছাড়াও জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ও সাবেক জেলা আমির অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁঞা জামায়াত থেকে প্রার্থী হতে পারেন বলে নাম শুনা যাচ্ছে। অপরদিকে ইসলামী আন্দোলন থেকেও হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে একজনের নাম ঘোষনা করা হয়েছে।
কয়েকজন ভোটার জানান- ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হলে যারা নির্বাচিত হয়ে ফেনীর উন্নয়ন ও অগ্রগতি অব্যহত রাখার পাশাপাশি শান্তি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে তাকেই আমরা নির্বাচিত করতে চাই।