আজ

  • বৃহস্পতিবার
  • ১লা অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ফেনীতে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের প্রিয় মুখ, মঞ্জিলা আক্তার মিমি

আপডেট : অক্টোবর, ৫, ২০১৮, ১২:৩৯ অপরাহ্ণ


স্টাফ রিপোর্টার>>> সোলেয়মান মাহদী
২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর ফেনী সদর হাসপাতালের সিঁড়ির নিচ থেকে ঠোঁটকাটা এক মেয়ে শিশুকে কুড়িয়ে পাওয়া যায়। চিকিৎসকদের ধারণা ১ মাস বয়সী ঠোঁটকাটা শিশুটিকে রেখে পালিয়ে চলে গেছে স্বজনরা।

চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল শহরের সুলতানপুর রেলওয়ে রাস্তার পাশ থেকে একটি মেয়ে নবজাতককে উদ্ধার করেন ফটো সাংবাদিক দুলাল তালুকদার। ১২ জুলাই শহরের রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে পথচারীরা উদ্ধার করেন আরও এক ছেলে নবজাতককে।

সর্বশেষ গেল মাসের ২০ তারিখ জেলার দাগনভূঞাঁ উপজেলার একটি প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে উদ্ধার করা হয় মেয়ে নবজাতককে। হাসপাতালের দেনা মেটাতে যে নবজাতককে মা বিক্রি করে দিয়েছিল মাত্র ১০ হাজার টাকায়।

মিমি কোলে হাসাপাতাল থেকে উদ্ধার করা কন্যা শিশু জান্নাতুল মাওয়াএ যে মানব শিশুগুলো-যারা পৃথিবীতে অবাঞ্চিত’র মতো যাদের দেখার কেউ নেই, জন্মটাই যেন আজন্ম পাপ তাদের। আবর্জনায় স্তুপে পচে মরার পরিবর্তে অসহায় স্বজনহারা এসব শিশুর ঠায় হয়েছে মঞ্জিলা মিমির কোলে, মায়ের পরম আদরে লালিত-পালিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ফেনী জেলা প্রশাসন ও সমাজ সেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে দু’টি মেয়ে শিশুর স্থান হয়েছে দু’টি পরিবারে। যে শিশুগুলো ছিল চরম অবহেলিত, মিমির ভালোবাসায় আজ তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

বলছি ফেনীর স্বেচ্ছাসেবী মানবিক ও সামাজিক সংস্থা ‘সহায়’র প্রধান সমন্বয়ক মঞ্জিলা মিমির কথা। শুধু নাম পরিচয়হীন শিশুগুলোকে লালন-পালন নয়, জেলার যেখানেই অসহায় মানুষের আহাজারি সেখানেই ছুটে যান এই নারী সমাজকর্মী। আর সে কারণেই ঘুরে-ফিরে ফেনীর মানুষের মুখে মুখে মিমির নাম।

প্রায়ই বলতে শুনি ‘আমরা সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, পাশের মানুষগুলো নিয়ে ভাবার সময় নেই’। কিন্তু নিজেকে ব্যস্ত থাকা মানুষগুলোর ভিড়েও আছে কিছু ব্যতিক্রম। যারা শুধু নিজেকে নয়, চারপাশের অসহায় দুঃস্থদের নিয়েও ভাবেন। দিনের একটা বিশাল অংশ কাটান মানুষের সেবা করেই। সেরকমই এক মানুষ মিমি। পুরো নাম মঞ্জিলা আক্তার মিমি। ফেনী শহর এবং পুরো জেলায় তাকে এক নামেই সবাই চেনে। মানুষের জন্য তার চিন্তা, চেতনা এবং কর্মস্পৃহাই তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে আমজনতার কাছে।
পথশিশুদের সঙ্গে মিমি
ফেনী শহরের পূর্ব উকিলপাড়ায় থাকেন তিনি। ফেনী সরকারি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স, মাস্টার্স সম্পন্ন করে ফেনী ল কলেজে পড়ছেন আইন বিষয়ে। দিনের যেটুকু সময় পান তার পুরোটাই কাটান অসহায় মানুষদের সেবায়। যেকেনো দুর্যোগে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে সহযোগী স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন সহযোগিতা করার জন্য।

শহরের পিছিয়ে পড়া শিশুদের স্বাক্ষরতা বাড়ানোর জন্য রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় গড়ে তুলেছেন ‘প্রত্যয় পাঠশালা’ নামের স্কুল। এতে তাকে সহায়তা করেন আরও কিছু তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরা। মিমির বেশিরভাগ সময় কাটে এসব পথশিশু আর তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে।

কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে কাজ শুরু করেন মিমি। আর্ত-মানবতার সেবার কাজের শুরুটা সেখান থেকেই। রেড ক্রিসেন্ট ফেনী ইউনিটের যুব প্রধান ছিলেন মিমি। তার কাজের ক্ষেত্র ও ধরন কিছুটা ভিন্ন। সমাজের একেবারে ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করতে ভালোবাসেন এই নারী সমাজকর্মী।

সম্প্রতি তিনি এবং তার সংগঠন ‘সহায়’র সব সদস্যদের নিয়ে ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন। এ সংগঠনের প্রচেষ্ঠায় এবং জেলার সিভিল সার্জন ডা. হাসান শাহরিয়ারের নির্দশনায় হাসপাতালটি অনুকরণীয় হয়ে উঠছে অন্য জেলা সদরের হাসপাতালগুলোর মধ্যে। আর এজন্য জেলার সর্বস্তরের মানুষ প্রশংসা করছেন মিমির সংগঠন এবং তাকে।

প্রত্যয় পাঠশালার শিশুদের পড়াচ্ছেন মিমিসিভিল সার্জন ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির বলেন, মিমি এবং তার সংগঠন সহায়’র সব সদস্য মিলে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন হাসপাতালটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে। তাদের প্রচেষ্টার কারণে এ হাসপাতালে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে।

ফেনী আধুনিক সদর হাসাপাতালের রোগীরা বলেন, এই হাসপাতালের অসহায় রোগীদের ভরসার জায়গা মিমি। তাদের চিকিৎসা, ওষুধ এবং সেবাযত্ন করে তিনি মহৎ কাজ করে যাচ্ছেন।

মিমি বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক কারণে মানুষের বিপদে ছুটে যাই। সমাজের অসহায় মানুষগুলোকে নিজের পরিবার বলে মনে কাজ করে যাচ্ছি। অসহায় মানুষের মুখে হাসিতে আনন্দ পাই। ‘বিপন্ন মানুষের পাশে থেকে তাদের জন্য কিছু করতে পারলে মনে একটা আনন্দ পাওয়া যায়। আমরা সবাই যদি নিজেদের অবস্থান থেকে এসব মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করি, তাহলে সমাজ আরও সুন্দর হবে।

তিনি আরও জানান, স্বেচ্ছাসেবী মানবিক ও সামাজিক সংস্থা ‘সহায়’র একদল তরুণ সহায়তা করেন এসব কাজে। সমাজের পিছিয়ে পড়া ৩য় লিঙ্গের মানুষ, বেদে সম্প্রদায়সহ অনগ্রসর মানুষদের জন্য আরও কিছু সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছেন মিমি। রয়েছে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিও।

ফেনী শহরের পূর্ব উকিলপাড়ায় পরিবার নিয়ে থাকেন মঞ্জিলা মিমি। বাবা আলী আজম ঠিকাদারি ব্যবসা করতেন। তিনি ২০০৩ সালে মারা যান। মা শাহানা আক্তার গৃহিণী। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে মিমি দ্বিতীয়।