আজ

  • বৃহস্পতিবার
  • ১লা অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত হয়েছে ফেনী দুই যুগে শতাধিক নৃশংস হত্যাকান্ড

আপডেট : এপ্রিল, ২১, ২০১৯, ৪:২৩ অপরাহ্ণ


সালাহ উদ্দিন মজুমদার>>>
সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত হয়েছে ফেনীর কিছু এলাকা। দীর্ঘদিন ধরেই আধিপত্য বিস্তার, ক্ষমতা বা নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে ঘটছে চরম নৃশংসতা-বর্বরতা। নিষ্ঠুরতার মাত্রাও এখানে বেশি। প্রভাবশালীদের পথের কাঁটা হলেই তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই খুন-ধর্ষণ,মামলা-হামলার শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। একের পর এক খুন, ধর্ষণ, হামলা ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ ঘটলেও তার যথাযথ বিচার বা শাস্তি হয় না জড়িতদের। এ কারণে বাড়ছে একের পর এক হত্যা, ধর্ষণ ও হামলার ঘটনা।

গত তিন দিন ফেনী শহর এবং সোনাগাজী,দাগনভূঞা, ও দাগনভুঁইয়া সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। স্থানীয় লোক জন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য মতে,গত দুই যুগে ফেনীতে আধিপত্য ও ক্ষমতার লড়াইয়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ শতাধিক হত্যাকান্ড ঘটেছে। এর বেশি ভাগ মামলারই যথাযথ বিচার বা জড়িতদের সেভাবে শাস্তিও হয়নি। মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফী হত্যাকান্ড ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে ফেনীতে খুন-ধর্ষণ ও হামলা-মামলার ঘটনা বেড়েছে। এসব অপরাধের ঘটনায় মামলা হলেও প্রায় ক্ষেত্রেই সেগুলো ধামাচাপা দেওয়া হয়। আড়ালে থেকে যায় গড ফাদাররা। তাদের নাম মুখে আনতেও ভয় পায় সবাই।

এর কারণ হিসেবে স্থানীয়রা বলছেন, ফেনীর অধিকাংশ হত্যাকান্ড আধিপত্য বা ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব হত্যাকান্ডের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়েন প্রভাবশালীরা। এর ফলে থানায় মামলা হলেও সঠিকভাবে তদন্ত হয় না। তদন্ত হলেও ভয়ে কেউ সাক্ষ্য দেন না। এর ফলে তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের দুর্বলতায় যথাযথ বিচারও পান না না ভুক্তভোগীরা। একাধিক ভুক্তভোগী পরিবারের মতে, রাজনৈতিক হত্যাকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা অতীতে মামলা করলেও সুবিচার পাননি। খুনিরা প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং নেপথ্যের গড ফাদারদের ছত্রছায়ায় আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যায় বারবার।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ৬ এপ্রিল সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফীর ওপর মধ্যযুগীয় বর্বরতার ঘটনায় ফেনীর নৃশংসতার চিত্রই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ একাধিক সমাজবিশ্লেষক বলেন,ফেনীতে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে রাফীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার মতো নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটেছে। এর আগেও ২০১৪ সালের ২০ মে ফেনী শহরের একাডেমি এলাকায় প্রকাশ্যে ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হককে কুপিয়ে, গুলি করে ও গাড়িসহ পুড়িয়ে ভয়াবহ নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করা হয়।

এ ঘটনায় গত বছরের ১৩ মার্চ ৩৯ জনের ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। মামলায় খালাস পান বিএনপি নেতা মাহতাব উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মিনারসহ ১৬ জন। এ মামলায় আসামি পক্ষ আপিল করেছে। যেভাবে গাড়ি আটকে বোমা মেরে, গুলি করে এবং আগুন ধরিয়ে একরামকে হত্যা করা হয় সেটি ছিল হলিউডের যেকোনো অ্যাকশন সিনেমার দৃশ্যকে হার মানানোর মতো ঘটনা। একটি জেলা শহরে এত বড় ধরনের পরিকল্পনায় নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনাটি বহুল আলোচিত হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য জয়নাল আবদীনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় হাফেজ আহম্মদ বাদী হয়ে ফেনী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য কামাল উদ্দিনসহ ৮-১০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। ২০ জানুয়ারি ফেনীর দাগনভ‚ঞা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফখরুল উদ্দিন চৌধুরীকে হত্যা করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর মামলা হলে তাতে দাগনভ‚ঞা পৌরসভার প্যানেল মেয়র সাইফুল ইসলাম এবং তার ভাই পারভেজ সওদাগরসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়। পরে মামলার তদন্ত যায় পিবিআইতে। ২০১৪ সালের ৬ আগস্ট ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সম্পাদক মোস্তফা মুনিরকে সোনাগাজী উপজেলার কুঠিরহাট যাওয়ার পথে গতিরোধ করে মোস্তফা মুনিরকে গাড়িতে তুলে নিয়ে কুপিয়ে জখম করে ফেলে যায় সন্ত্রাসীরা। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ১৭ নেতার নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়। ২০০১ সালে সোনাগাজীর চর ইঞ্জিমানে বিএনপি-যুবদল ও ছাত্রদলের ১০-১২ জন নেতাকর্মীকে গুলি করে হত্যার পর লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। ‘চর ইঞ্জিমান ট্র্যাজেডি’ হিসেবে পরিচিত এই নৃশংস ঘটনায় দায়ের করা মামলা থেকেও খালাস পেয়ে যায় প্রভাবশালী আসামিরা। তার আগে ১৯৯৭ সালে তুষার নামে এক ছাত্রদল নেতাকে ড্রিল মেশিন দিয়ে ছিদ্র করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন আহূত হরতাল চলাকালে শহরে বের হওয়া বিএনপির মিছিলে প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ার করা হয়।

এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন জেলা যুবদলের তৎকালীন যুগ্ম আহবায়ক শরিফুল ইসলাম নাসির। এ দুটি মামলারও যথাযথ বিচার হয়নি। ২০০০ সালে শহরের একাডেমি সড়কে যুবলীগ নেতা আবুল বশরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে সন্দেহের আঙুল উঠেছিল তারা সবাই মামলা থেকে বেঁচে যায়। ২০০১ সালে মহিপালে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে যুবদল নেতা গিয়াসউদ্দিন খুনের ঘটনায়ও জড়িতদের কিছুই হয়নি।

ফেনীর একাধিক আইনজীবী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, ফেনীর হত্যাকান্ড গুলো অধিকাংশই রাজনৈতিক প্রভাব,আধিপত্য ও নেতৃত্বের দ্বদ্বেই ঘটেছে। যেহেতু প্রভাবশালীদের লড়াইয়ের ফলে এসব ঘটনা ঘটে সে কারণে সাধারণ মানুষ বা অসহায় ভুক্তভোগীরা মামলার খুব বেশি সুফল পান না। আর এই বিচার হীনতার রেওয়াজ চলে আসায় অপরাধীরাও একের পর এক নৃশংস ঘটনা ঘটাতে সাহস পায়।
সূত্রেঃ সময়ের আলে ২১ এপ্রিল।