আজ

  • সোমবার
  • ১০ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
  • ২৭শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ফেনীসহ মাদকে ভাসছে দাগনভুঞাঁ অঞ্চল : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরে চিঠি

আপডেট : মে, ২৫, ২০১৯, ২:২৯ অপরাহ্ণ


সালাহ উদ্দিন মজুমদার>>>
ফেনীর দাগনভূঞা উপজলার প্রায় ২০টি স্পটে অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী প্রকাশ্যে মাদকের বেচাকেনা করছেন। কোনো কোনো এলাকায় ফেরি করে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা ও গাঁজা। সব মিলিয়ে মাদকে ভাসছে এ উপজেলা। বর্তমান পরিস্থিতিতে মাদকের আগ্রাসনে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে স্থানীয় শিশু-কিশোর ও যুব সমাজ। চোখের সামনে নিজ সন্তানের করুণ পরিণতি দেখেও কিছুই করার নেই অভিভাবকদের। অসহায় এ অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের অধঃপতন দেখছেন আর শুধুই চোখের জল ফেলছেন। সড়ক পথের ভালো যোগাযোগের কারণে দাগনভূঞাকে ট্রানজিট হিসেবে বেছে নিয়েছে নোয়াখালীর সেনবাগ, কোম্পানিগঞ্জ ও আশপাশের অন্যান্য উপজেলার মাদক ব্যবসায়ীরা।
প্রতিদিন মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও চট্টগ্রাম হয়ে হাজার হাজার পিস ইয়াবাসহ এসব নেশা জাতীয় মাদক আসছে দাগনভূঞায়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পাশের উপজেলা গুলোতে ইয়াবা যাচ্ছে দাগনভূঞা থেকেই। সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, এসব এলাকায় ৩শ থেকে ৪শ টাকায় বিক্রি হয় ইয়াবা। আর সহজলভ্য গাঁজা মিলছে হাত বাড়ালেই। ২০ থেকে ৩০ টাকায় গাজা বিক্রি হচ্ছে ফেরি করে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, এখানে অন্তত ২০টি মাদকের স্পট রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় স্পট রাজাপুর ইউপির সাপুয়া গ্রামে।

এ স্পট পরিচালনা করে ইউনিয়নের কামার পুকুরিয়া গ্রামের উপজেলা পর্যায়ের এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ছোট ভাই। একই ইউনিয়নের বাশশিরি, লতিপপুর,নন্দিরগাঁও, জাঙ্গালিয়া, সমাসপুর, পূর্বচন্দ্রপুর ইউপির বৈঠারপাড়া, গজারিয়া ও জায়লস্কর ইউপির খুশিপুরসহ এ সংলগ্ন আরও বেশ কয়েকটি স্পট পরিচালনা করেন সে।

তবে, তার ব্যবসার দেখভাল করেন সাপুয়া গ্রামের প্রয়াত আবু তাহের ছেলে মো, বাবু (৩০), প্রয়াত ফয়েজ আহাম্মদের ছেলে হোসেন (২২), জাঙ্গালিয়া গ্রামের মীর কাশেমের ছেলে ফরহাদ (২০), মহি উদ্দিনের ছেলে দিদার (২০), পূর্ব চন্দ্রপুর ইউপির আবদুল খালেকের ছেলে রাজন ওরফে রাজুসহ (২৫) ১০ থেকে ১৫ জনের একটি সিন্ডিকেট। প্রতিদিন দিনে-রাতে এদের মাধ্যমে সাপুয়া ও কামারপুকুরিয়া এলাকা থেকে প্রকাশ্যে চলে মাদক সর্বরাহ। এছাড়া এদের কাছ থেকে পাইকারী দরে সংগ্রহ করে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে খুচরা বিক্রি ও সেবন করে আরও অন্তত ১৫টি স্পটে। এর মধ্যে সিন্দুরপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর, কৌশল্যাহ, অলাতলী। পূর্ব চন্দ্রপুর ইউনিয়নের কেরোনীয়া, নয়নপুর, প্রতাপপুর। রামনগর ইউনিয়নের তুলাতলী, সেকান্তরপুর। ইয়াকুবপুর ইউনিয়নের বরইয়া, দেবরামপুর, এতিমখানা বাজার। দাগনভূঞা সদর ইউনিয়নের জগতপুর, দক্ষিণ আলীপুর।

মাতুভূঞা ইউনিয়নের আলীপুর, মোমারিজপুর।জায়লস্কর ইউনিয়নের নেয়াজপুর, হীরাপুর, খুশিপুর উল্লেখযোগ্য। এসব এলাকার পাইকারী ক্রেতা ছাড়াও সাপুয়া গ্রামে এসে খুচরা দরে ইয়াবা ও গাঁজা সংগ্রহ করতে প্রতিদিন রাতে ভিড় করে উপজেলার বিভিন্ন স্ট্যান্ডের সিএনজি অটোরিক্সা চালকরা। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় অনেক নেতাকে ম্যানেজ করতে হয় মাদক ব্যবসায়ীদের। তবে কথিত এসব রাজনৈতিক নেতা মাসোয়ারার পরিবর্তে সপ্তাহে টাকা নিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী বলেছেন, রাজনৈতিক এসব নেতাকে টাকা অথবা (বাবা) না দিলে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করা যায় না। তাদের ভাষায়, ‘টাকা দিতে দেরি হলে নানাভাবে তারা ডিস্টার্ব করে।’

জানা যায়, এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কেউ মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে না পারলেও এ মরণ নেশা থেকে নিজের কিশোর ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে গত ১১ এপ্রিল বিষপাণে আত্মহত্যার চেষ্টও করেন সাপুয়া গ্রামের আলেয়া (৫০) নামের এক মা। এরপর মাকে বাঁচাতে এ সিন্ডিকেটের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ওয়াদা করে বিপাকে পড়েন আলেয়ার ছোট ছেলে ইমাম হোসেন রায়হান। মাদক ব্যবসায়ীরা উল্টো মাদক দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তাদের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় গত ১৩ এপ্রিল সাপুয়া গ্রামের চন্দ্রমনিরটেক নামক স্থানে আবচার মিয়ার মুদি দোকানের সামনে রায়হানকে ওপর হামলা চালায় মাদক ব্যবসায়ীরা। পরে মাদক চক্রের কাছ থেকে রক্ষা পেতে ফেনীর পুলিশ সুপার ও র‍্যাব কার্যালয়ে গিয়ে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানায় রায়হানের পরিবার।

সে সময় এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের পরামর্শ দেওয়া হয়। পরদিন ১৪ এপ্রিল আলেয়া বেগমের স্বামী আমির হোসেন (৫৫), ছেলে রায়হানকে (১৭) নিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়েরের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলে ওই মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য মো. হোসেন, বাবু, ফরহাদ, দিদারসহ আরও অজ্ঞাত ৭ থেকে ৮জন মিলে তাদের পথ আটক করে। এসময় তাদের মাদক ব্যাবসায় সহযোগীতা না করলে রায়হান ও তার পিতাকে ২ লক্ষ টাকা চাঁদা দিতে হবে বলে হুমকি দেয় তারা। এনিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তাদের হাতে থাকা বেতের লাঠি দিয়ে আমির হোসেন ও রায়হানকে পিটিয়ে আহত করে। পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে তাদেরকে উদ্ধার করে ফেনী জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়।

এ ঘটনার দুই দিন পর গত ১৬ এপ্রিল আহত আমির হোসেন বাদী হয়ে ৬জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৭ থেকে ৮জনকে আসামি করে ফেনীতে সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট দাগানভূঞা আমলী আদালতে মামলা দায়ের করেন। একই দিন মামলার এজহার পর্যালোচনা ও বাদীর জবানবন্দি শুনে আগামী ১৪ মের মধ্যে এ ব্যাপারে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দাগনভূঞা থানার ওসিকে নির্দেশ প্রদান করেন আদালত।

এদিকে এরই মধ্যে ফেনীস্থ র‍্যাব-৭ ও দাগনভূঞা থানা পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন উল্লেখ করে স্থানীয়রা জানান, ধীরে ধীরে এ ব্যাপারে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠছেন সাপুয়া, বৈঠারপাড়া ও গজারিয়া এলাকার মাদকে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো। গত কয়েকদিন ধরে এ সর্বনাশা মাদক ও এর সঙ্গে জড়িতদের প্রতিকারে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন তারা। এরপর গত ২৮ এপ্রিল সেগুলো ডাকযোগে রেজিষ্ট্রি করে প্রেরণ করেছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, থানা,উপজেলা চেয়াম্যান, নির্বাহী কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার, র‍্যাব ও পুলিশ হেড-কোয়ার্টার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।
অপর দিকে জেলা শহরের একাডেমি এলাকায় বিরিঞ্চি,হাসপাতাল রোড সহ বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ এর ডিবি প্রতিদিনেই ইয়াবার ছোট চালান এবং খুচরা বিক্রেতাদের কে আটক করছে।