আজ

  • শুক্রবার
  • ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ৩রা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুন্ন,ভূয়া করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেটেই দ্বায়ী

আপডেট : জুলাই, ৯, ২০২০, ৭:৪৮ অপরাহ্ণ

অফিস ডেস্ক >>>

১২৫ বাংলাদেশিকে বিমান থেকে নামতে দেয়নি ইতালি বিপাকে লক্ষাধিক বাংলাদেশি।
বাংলাদেশ থেকে পরীক্ষা করে কভিড-১৯ নেগেটিভ সনদ নিলেও সেটিকে সন্দেহের তালিকায় রাখছে বহির্বিশ্ব। কারণ এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বিমান যাত্রীদের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সংস্থার শর্ত ভঙ্গ করায় একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। এতে করে একদিকে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে অন্যদিকে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বিদেশে ফিরতে ইচ্ছুক লক্ষাধিক বাংলাদেশি অভিবাসী ।

ইতোমধ্যে ঢাকায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরীক্ষা না করেই ভুয়া সনদ দেয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সর্বশেষ রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতাল করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ দিত বলে প্রমাণ পেয়েছে র‌্যাব। উত্তরা ও মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে আটজনকে আটক করেছে র‌্যাবের মোবাইল কোর্ট। হাসপাতালটি টেস্ট না করেই কভিড-১৯ ‘পজিটিভ’ ও ‘নেগেটিভ’ সনদ দিত। এ অভিযোগে হাসপাতালটি সীলগালা করে দেয়া হয়েছে।
সর্বশেষ কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে করে ইতালি যাওয়া ১২৫ বাংলাদেশিকে বিমান থেকে নামতে দেয়া হয়নি। তাদের ওই বিমানেই ফেরত পাঠানো হয়েছে। গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় দুপুর ১টার দিকে ফিউমিসিনো বিমানবন্দরে ওই বিমানটি অবতরণ করে। ইতালির জাতীয় দৈনিক ইল মেসসাজ্জেরোর অনলাইন সংস্করণের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বাংলাদেশি যাত্রীদের ইতালিতে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। তাদের সেদিনই একটি ফ্লাইটে কাতার ফেরত পাঠানো হয়েছে।
এর আগে গত সোমবার ঢাকা থেকে রোম যাওয়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইটের ২১ যাত্রী কভিড-১৯ পজিটিভ শনাক্ত হয়। এর আগে যাওয়া বিশেষ ফ্লাইটের ১৮ যাত্রীরও করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে দেশটির পরীক্ষায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের ফ্লাইট এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে ইতালি সরকার। হঠাৎ ফ্লাইট বন্ধের এ ঘোষণায় দেশে আটকা পড়েছেন ইতালি ফিরতে ইচ্ছুক হাজার হাজার অভিবাসী বাংলাদেশী।
শুধু ইতালির ফ্লাইটই নয়, দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হওয়ায় আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ করেছে তুরস্কও। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর গত ৩ জুলাই ইস্তাম্বুল-ঢাকা রুটে ফ্লাইট চালুর কথা ছিল টার্কিশ এয়ারলাইনসের। তবে হঠাৎ করেই বেশকিছু দেশের সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় তুরস্ক। মূলত করোনাভাইরাস সংক্রমণের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং বিস্তার রোধে এ পদক্ষেপ নেয় দেশটি। এতে ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায় টার্কিশ এয়ারলাইনসের ঢাকার ফ্লাইট। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশীদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সউদী আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশেও। স¤প্রতি বাংলাদেশে ফ্লাইট চালু করেছে কাতার এয়ারওয়েজ ও এমিরেটস এয়ারলাইনস। তবে কেবল ট্রানজিট যাত্রীই পরিবহন করছে এয়ারলাইনস দুটি। কারণ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকিতে থাকায় বাংলাদেশীদের প্রবেশাধিকার নেই কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। বাংলাদেশীদের জন্য একই রকম ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও।
গত মঙ্গলবার ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ঢাকা থেকে ইতালি যাওয়া বিশেষ ফ্লাইটের যাত্রীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যকের করোনা পজিটিভ এসেছে। এ কারণে এক সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করা হলো। ফ্লাইট বন্ধের এই সময়ে ইতালি সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও শেনজেন অঞ্চলের বাইরে থেকে যাওয়া সবার জন্য নতুন করে পূর্ব সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করবে।
জানা গেছে, গত ১৭ জুন প্রথম বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইটে রোমে ফিরে যান ২৫৯ জন প্রবাসী। এরপর গত দুই সপ্তাহে হাজার খানেকের মতো প্রবাসী বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে ইতালি ফিরে গেছেন। সর্বশেষ গত সোমবার বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকা থেকে ইতালি ফিরে যান ২৭৬ বাংলাদেশী। এর আগে ২ জুলাই ২৭৬ জন যাত্রী নিয়ে রোমে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান। বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে যাওয়া যাত্রীরা সবাই দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। সেখানে মহামারী দেখা দিলে দেশে ফিরে আসেন তারা। এখন পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় ইতালিতে ফিরে যাওয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের জন্য এ বিশেষ ফ্লাইটটি পরিচালনা করা হয়।
আলাপকালে দেশে অবস্থানরত ইতালি প্রবাসী আরাফাত হোসাইন জানান, আন্তর্জাতিক রুটে ভ্রমণের জন্য কভিড-১৯ ‘নেগেটিভ’ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনেকে কভিড-১৯ টেস্ট করেছেন। কিন্তু সময়মতো ফ্লাইটের টিকিট কাটতে না পারায় সেটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। যাদের কভিড-১৯ টেস্ট পজিটিভ এসেছে অথচ ফ্লাইটের তারিখ ঘনিয়ে এসেছে তাদের কেউব কেউ টাকা দিয়ে ভূয়া ‘নেগেটিভ’ সার্টিফিকেট নিয়ে রওনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি যতোদূর জেনেছি বিমান বন্দরে ২/৩ হাজার টাকা নিয়ে ভূয়া সার্টিফিকেটধারীদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। মূলত এরাই বিদেশে গিয়ে পজিটিব হিসাবে ধরা পড়েছেন। এতে করে আমার মতো হাজার হাজার অভিবাসীর বিদেশ ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
র‌্যাব জানায়, রিজেন্ট হাসপাতাল করোনা টেস্টের জন্য সংগৃহীত নমুনা তিনটি প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে পরীক্ষা করাতো। সেগুলো হলো- মহাখালী ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ (জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেনটিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন (নিপসম) এবং রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। কিন্তু গত ২৩ মে’র পর পাবলিক হেলথে কোনও নমুনা না পাঠিয়েও এই প্রতিষ্ঠানের নামে রোগীদেরকে করোনা টেস্টের রিপোর্ট দিয়েছে রিজেন্ট হাসপাতাল। এছাড়াও এই হাসপাতালটি আইইডিসিআর ও নিপসমের প্যাড-সিল জালিয়াতি করেও রিপোর্ট দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিদেশগামী যাত্রীদেরকে কভিড-১৯ নেগেটিভ সার্টিফিকেট দিয়েছে রিজেন্ট হাসপাতাল। সেই সব যাত্রীই বিদেশে গিয়ে করোনা ‘পজিটিভ’ বলে ধরা পড়েছে। এতে করে একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট।
এর আগে গত এপ্রিলে প্রবাসী বাংলাদেশীদের জাপান ফেরাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ ভাড়া করে তিন-চারটি চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। ওই সব ফ্লাইটে যাওয়া যাত্রীদের বাংলাদেশে পরীক্ষা চালিয়ে করোনার নেগেটিভ রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু জাপান যাওয়ার পর পরীক্ষা করলে তাদের মধ্যে চারজনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে মে মাসের প্রথমদিকে শর্ত আরোপ করে দেশটি। এ কারণে বাংলাদেশী কোনো নাগরিক এখন জাপানে যেতে পারছেন না। একই ঘটনা ঘটেছে দক্ষিণ কোরিয়াগামী চার্টার্ড ফ্লাইটের আরোহী যাত্রীদের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশে পরীক্ষা চালিয়ে এসব যাত্রীর সংক্রমণ শনাক্ত না হলেও দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়া অন্তত ছয়জন বাংলাদেশী এবং একজন কোরীয় নাগরিকের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ জুন দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আগত মানুষের মাধ্যমে নতুন করে সে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ অনেক বেড়ে যাওয়ায়, এই দুই দেশের নাগরিকদের কোরিয়ার ভিসা এবং প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে। যা এরই মধ্যে বাস্তবায়ন করেছে দেশটি। তবে ক‚টনৈতিক এবং জরুরি ব্যবসায়িক কাজের ক্ষেত্রে অবশ্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।
অন্যদিকে গত ১১ জুন ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংঝু শহরে যাওয়া চায়না সাউদার্নের একটি ফ্লাইটের ১৭ জন যাত্রীর নমুনা পরীক্ষায় করোনাভাইরাস পজিটিভ শনাক্ত হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে চায়না সাউদার্নের ঢাকার ফ্লাইট চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছে চীনের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। নিষেধাজ্ঞার ফলে গত ২২ জুন থেকে চার সপ্তাহ চীনের এই উড়োজাহাজ সংস্থা ঢাকায় ফ্লাইট চালাতে পারছে না।

তথ্য সুত্র
ইনকিলাব